রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গ্রীষ্মের দুপুরের তেতলার ছাদ থেকে আমাদের শৈশবের চিলেকোঠা
বিস্তারিত · Description
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গ্রীষ্মের দুপুরের তেতলার ছাদ থেকে আমাদের শৈশবের চিলেকোঠায় কাটানো একলা মুহূর্ত পেরিয়ে যখন নিজেদের আস্তানায় আমরা এক পা দু পা করে এগিয়েছি, চিলেকোঠা, তেতলার ছাদ মিশে গেছে ছোটবেলার পাইলট, অ্যাস্ট্রোনাট হওয়ার স্বপ্ন গুলোর মতোই - কোনও দিগন্তে। তাই, আপার লিংসেনবং সম্পর্কে যখন শুনলাম আর ছবিতে প্রতীক তানিয়ার বাড়ির অ্যাটিক স্টাইলের পাহাড়ি আস্তানা দেখলাম, তখন তর সইল না আর।
চলে এলাম। শিলিগুড়ি থেকে সুখিয়া, মানেভঞ্জন হয়ে, ধোত্রের পাশ দিয়ে এলাম এই বাড়িতে।
বাড়ির নাম ফ্রি সোলস স্টে। মুক্ত মনের ঠিকানা।
ক্ষেতের মধ্যে আঁকা বাঁকা পথ ধরে শর্ট কাট ধরে যেই উঠলাম, সামনের বড়দাদার মতো পাহাড় আর তার আশ্রয়ে মেঘ তুলে ধরল বরাবরের ভালো লাগা। এটা ওদের নিজেদের বাড়ি।
দুজন মিলে তৈরি করা পাহাড়ে বাড়ি। আমাদের সকলের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছে ওরা দুজন।
A ফ্রেমের কটেজ। অ্যাটিক স্টাইলের রুম দোতলায় , নিচের ফ্লোরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেই কাঠের সজ্জা এবং মন ভালো করা একটি জানলা।
জানালার ওপারে মুক্তি। জঙ্গলের পথ ধরে আধঘণ্টা মতো চললে পাওয়া যায় এক ঝর্ণার সন্ধান।
কয়েকটি বড় পাথরের ধার ঘেঁষে স্বচ্ছ জলের ধারা নেমে যাচ্ছে বিপুলবেগে। ঝর্ণার উপরে মেঘ জমেছে।
কিছু মেঘ সঙ্গ দিতে আসছে নিচের উপত্যকা থেকেও। মেঘ ঢেকে দিচ্ছে গোটা এলাকা।
শেষ বর্ষার রেশ এখনও কাটেনি পাহাড় থেকে, বৃষ্টিস্নাত জঙ্গল সবুজের শেড লাগিয়েছে ইচ্ছে মতো, তার রঙের অভাব হয়নি। ট্রেক থেকে ফিরে পাই, অনন্য স্বাদের লাঞ্চ।
আয়োজনে মুগ্ধ হাত নিমেষে খালি করে দেয় থালা। এতদূর এসেও বাঙালি স্বাদের এই ব্যাপারটা অন্য একটা তৃপ্তি এনে দেয়।
এবার বিশ্রাম। শান্ত গ্রামে কেবল হাওয়ায় মাথা নাড়ানো ভুট্টা ক্ষেতের শব্দ আসে।
ঘরের লাগোয়া ছোট ব্যালকনিতে বসি। ধূসর আকাশে মেঘ আসা যাওয়া করে, ধেয়ে আসে আমার দিকে, ঝাপসা করে, আবার নিমেষে বাড়িঘর সব স্পষ্ট হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ বসে একটু গ্রাম দেখতে বেরোই। এই গ্রামের বসতি খুব কম, এবং আশেপাশে কোনও স্টে নেই।
পথচলতি মানুষের আনা গোনা একেবারেই নেই। কয়েকশো গজ পেরোলে বা নেমে এলে বহু প্রাচীন এক মাটির বাড়ি দেখা যায়।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। কাঠের আর মাটির এই বাড়ি জীবন্ত ইতিহাস হয়ে গ্রামের পথ আগলে আছে।
বিকেল ঘন হয়ে আসে, ভুট্টার ক্ষেত বিকেলের আলোয় মাখামাখি হয়ে থাকে, আমি আবার এবার বড় রাস্তা ধরেই আবার উঠি, আলপথ পাশে রেখে। কেবলমাত্র বর্ষাকাল ছাড়া গাড়ি সম্পূর্ণ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়, বর্ষাকালেও ফোর বাই ফোর হলে পৌঁছে যাবে দোরগোড়ায়।
সন্ধের চা সহযোগে আজ আসে তাইপও। দুর্গম এই পাহাড়ের কোলে - যেখানে গ্যাস সিলিন্ডার ঘাড়ে করে তুলতে হয়, সামান্য জল, বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্কের মতো বর্তমান নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলোর সাথেও লড়াই করতে হয়, সেখানে দুই আদ্যপান্ত বাঙালির বাড়ি বসে এহেন কুইজিনের স্বাদ - প্রশংসার দাবী রাখে।
ডাইনিংয়ের ধার দিয়ে ওয়ার্ম লাইট দিয়ে একটা ওপেন টেরেস রয়েছে, রয়েছে বড় টেবিলও। সন্ধের চা কফি, আড্ডা আকাশের নিচে।
হলুদ আলো আর কুয়াশার মাঝে বসে এই আড্ডার চা কফি ঠান্ডা হয়ে যায় কিন্তু উষ্ণতা কমেনা আলোচনার। আলো নেভার পর থেকে রাতের চেহারা একই থাকে এই নির্জন গ্রামে।
সময়ের সাথে সাথে আমরাই কেবল ঘরে ফিরি, ডিনার করি, আর তারপর এই পাহাড়ের কোলে এক সময় নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়ি। ভোর হয়, মেঘ কুয়াশা পাহাড়ের খেলা দেখতে দেখতে বেলা বাড়ে, ফেরার তোড়জোড় চলে, ব্যাগপত্তর গোছানোর শেষে আরেকবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাই , কাঠের পাটাতনে হেঁটে বেড়াই, জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকি।
মন যেন আর ভরে না। আরেকবার করে ঘুরে বেড়াই স্টে জুড়ে।
ভুট্টার ক্ষেত মাথা দোলায়, কুয়াশা ঢাকে, কুয়াশা মাখে - আমি আলপথ ধরে পেছনে তাকাতে তাকাতে এগোই। এক পা দু পা করে, আমার তেতলার ছাদ, আমার চিলেকোঠার ঘর… Free soul's Stay খাওয়া - থাকা মাথা পিছু ১৪০০-১৮০০ টাকা করে।
( কতজন একটা ঘরে থাকছেন তার ওপর নির্ভর করছে) প্রতীক - +91 90382 30253
